অটোরিকশা বন্ধ নয়, ডিজিটাল নিবন্ধন ও কিউআর কোডের আওতায় আনার উদ্যোগ
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা পুরোপুরি বন্ধ না করে ডিজিটাল নিবন্ধন, কিউআর কোড ও ট্র্যাকিং ব্যবস্থার আওতায় এনে নিয়ন্ত্রণে আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
সোমবার জাতীয় সংসদে জরুরি জন-গুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণ নোটিশের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, অটোরিকশা ব্যবস্থাপনার জন্য ইতোমধ্যে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে।
নীতিমালা অনুযায়ী, প্রতিটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে ডিজিটালভাবে নিবন্ধন করে কিউআর কোড ও ট্র্যাকিং ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হবে। এর ফলে একটি নিবন্ধন নম্বর ব্যবহার করে একাধিক অবৈধ অটোরিকশা চালানোর সুযোগ বন্ধ হবে।
চালকদের কর্মসংস্থানও বিবেচনায়
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, স্থানীয় সরকার বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে তৈরি নীতিমালায় অটোরিকশা চালকদের কর্মসংস্থানের বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সড়ক নিরাপত্তা, পরিবেশ, বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে এসব যানবাহনকে নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
অটোরিকশায় ব্যবহৃত পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর লেড-অ্যাসিড ব্যাটারির পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব ব্যাটারি ব্যবহারের ওপরও নীতিমালায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
দেশে ৫০-৮০ লাখ বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে আনুমানিক ৫০ থেকে ৮০ লাখ বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার চলাচল করছে। এসব যান দেশের মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় ৫ শতাংশ ব্যবহার করে।
অন্যদিকে বৈধ চার্জিং পয়েন্টের সংখ্যা মাত্র প্রায় ৩ হাজার ৩০০টি। শুধু রাজধানী ঢাকাতেই প্রায় ৪৮ হাজার অনানুষ্ঠানিক ও অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের কারণে সরকার বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এসব সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে ডিএমপি, ডেসকো ও ডিপিডিসির সমন্বিত অভিযান চলছে।
দুর্ঘটনার সঙ্গেও জড়িত অটোরিকশা
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গত এক দশকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইক দেশের গ্রামীণ এবং শহুরে পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। কম খরচে যাতায়াতের সুযোগের পাশাপাশি চালক, গ্যারেজকর্মী, যন্ত্রাংশ ব্যবসায়ী ও চার্জিং সেবার সঙ্গে যুক্ত বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।
তবে অনিয়ন্ত্রিতভাবে এসব যানবাহনের সংখ্যা বাড়ায় সড়ক নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।
২০২৫ সালের সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, ওই বছর দেশে ৬ হাজার ৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯ হাজার ১১ জন নিহত হন। এর মধ্যে ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ দুর্ঘটনার সঙ্গে অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংশ্লিষ্টতা ছিল।
রাজধানীতে আরও ২০০ এআই ক্যামেরা
অটোরিকশার নম্বর প্লেট না থাকায় ট্রাফিক আইন ভঙ্গের ঘটনায় শনাক্ত করার পরও অনেক ক্ষেত্রে জরিমানা বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না—এমন বিষয় সংসদে তুলে ধরেন সরকারি দলের সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু।
তিনি অটোরিকশা নিষিদ্ধ না করে নম্বর প্লেট, চালকদের প্রশিক্ষণ ও ড্রাইভিং লাইসেন্সের আওতায় এনে নিয়ন্ত্রণের প্রস্তাব দেন। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ সড়কে চলাচলের সুযোগ, সৌরবিদ্যুৎভিত্তিক চার্জিং অবকাঠামো, বিআরটিএ নিবন্ধন এবং এলাকাভিত্তিক চলাচল ব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করেন।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রধান সড়কে অটোরিকশা চলাচল নিয়ন্ত্রণে ডিএমপি নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। পাশাপাশি রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ক্যামেরার ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে।
তিনি জানান, বর্তমানে ১৭টি সিগন্যালে ৫০টি এআই ক্যামেরা থেকে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে। এর ধারাবাহিকতায় তেজগাঁও ও রমনা বিভাগে আরও ২০০টি এআই ক্যামেরা স্থাপনের কাজ চলছে। পর্যায়ক্রমে পুরো রাজধানীতে এ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অটোরিকশা বন্ধ করে দেওয়ার পরিবর্তে সরকার এগুলোকে নিবন্ধিত, ডিজিটাল ও শৃঙ্খলিত ব্যবস্থার মধ্যে আনতে চায়। জাতীয় স্বার্থ, সড়ক নিরাপত্তা, পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য এবং সংশ্লিষ্ট মানুষের কর্মসংস্থানের বিষয় বিবেচনায় নিয়ে নীতিমালাটি দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে।









