অর্থায়ন বন্ধ, থমকে আছে দেশে অ্যান্টিভেনম তৈরির গবেষণা

নিজস্ব প্রতিবেদক | আদর্শ গ্রাম

বাংলাদেশে সাপের কামড়ে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় স্থানীয় প্রজাতির উপযোগী অ্যান্টিভেনম বা বিষের প্রতিষেধক তৈরির উদ্যোগ অর্থসংকটে থমকে আছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে অবস্থিত দেশের একমাত্র ভেনম রিসার্চ সেন্টার রাসেলস ভাইপারের অ্যান্টিবডি তৈরির কাজ শেষ করে দুই বছর আগে সরকারের কাছে প্রতিবেদন জমা দিলেও পরবর্তী গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ পায়নি।

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩০ জুনের পর থেকে কেন্দ্রটির সরকারি অর্থায়ন বন্ধ রয়েছে। ফলে নতুন সাপ সংগ্রহ, বিষের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ এবং অন্যান্য বিষধর সাপের অ্যান্টিবডি নিয়ে গবেষণার কাজ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

স্থানীয় সাপের জন্য অ্যান্টিভেনম তৈরির উদ্যোগ

২০১৮ সালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসে ভেনম রিসার্চ সেন্টার প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রাথমিকভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিষধর সাপ সংগ্রহ, তাদের বিষের নমুনা সংরক্ষণ এবং বিষের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করা ছিল প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য। দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশে অ্যান্টিভেনম তৈরির সক্ষমতা গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।

কেন্দ্রটির মুখ্য গবেষক ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক অনিরুদ্ধ ঘোষ জানান, রাসেলস ভাইপারের অ্যান্টিবডি তৈরির কাজ শেষ করে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন সরকারের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী পর্যায়ে গোখরা ও ক্রেইটের মতো সাপের বিষের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরির পরিকল্পনা ছিল। তবে অর্থায়ন বন্ধ থাকায় সেই কাজ শুরু করা যায়নি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক মো. হালিমুর রশীদ জানিয়েছেন, আগের অপারেশনাল প্ল্যানের অধীনে পরিচালিত প্রকল্পগুলোকে রাজস্ব খাত অথবা উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবের (ডিপিপি) আওতায় নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে ভেনম রিসার্চ সেন্টারের অর্থায়ন কোন খাত থেকে হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

ভারতীয় অ্যান্টিভেনম নিয়ে প্রশ্ন

বাংলাদেশে সাপের কামড়ে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় বর্তমানে ভারত থেকে আমদানি করা অ্যান্টিভেনম ব্যবহার করা হয়। গবেষকদের মতে, ভারতীয় অ্যান্টিভেনম মূলত দেশটির নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রজাতির সাপের বিষের ভিত্তিতে তৈরি। একই প্রজাতির সাপের বিষেও ভৌগোলিক ও পরিবেশগত কারণে পার্থক্য থাকতে পারে। ফলে বাংলাদেশের স্থানীয় সাপের বিষের বিরুদ্ধে এর কার্যকারিতা সব ক্ষেত্রে সমান নাও হতে পারে।

ভেনম রিসার্চ সেন্টারের গবেষকেরা জানিয়েছেন, তাঁরা দেশের ১১ প্রজাতির বিষধর সাপের বিষ সংগ্রহ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে গোখরা, কিং কোবরা, ক্রেইট, রাসেলস ভাইপার ও পিট ভাইপারের বিভিন্ন প্রজাতি। তবে নতুন গবেষণা ও বিষ সংগ্রহের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

সাপের কামড়ে মৃত্যু কমাতে গবেষণার গুরুত্ব

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সাপের কামড়কে একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করে। সংস্থাটি ২০৩০ সালের মধ্যে সাপের কামড়ে মৃত্যুর সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

বাংলাদেশে সাপের কামড়ের ঘটনা বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় বেশি ঘটে। চিকিৎসার পরিবর্তে ওঝা বা ঝাড়ফুঁকের ওপর নির্ভরতা এবং হাসপাতালে যেতে দেরি করার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। তাই দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া, চিকিৎসকের পরামর্শে উপযুক্ত অ্যান্টিভেনম প্রয়োগ এবং স্থানীয় সাপের বিষের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী গবেষণা এগিয়ে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গবেষণা অব্যাহত রাখতে স্থায়ী অর্থায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। স্থানীয় সাপের বিষের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিষেধক তৈরির সক্ষমতা গড়ে উঠলে দেশের সাপের কামড়ের চিকিৎসায় তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

Loading

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

অনুসরন করুন

সর্বশেষ খবর

আর্কাইভ