জার্মানিতে উগ্র ডানপন্থী দল এএফডির জনপ্রিয়তা বাড়ছে, তবে এখনো থামানো সম্ভব। জার্মানির মূলধারার দলগুলোর সামনে এখনো সুযোগ আছে। কার্যকর রাজনৈতিক পদক্ষেপ নিতে পারলে দেশটির উগ্র ডানপন্থী দল অলটারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি)-এর উত্থান ঠেকানো সম্ভব।
পূর্ব জার্মানির স্যাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্যের নির্বাচনে উগ্র ডানপন্থী দল অলটারনেটিভ ফর জার্মানি বা এএফডির জয় জার্মানির রাজনীতিতে বড় ধরনের সতর্কবার্তা। দলটি ৪৪ শতাংশ ভোট পেয়েছে। ৮৩ আসনের রাজ্য আইনসভায় তারা পেয়েছে ৩৯টি আসন।
তবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি এএফডি। কিন্তু সরকার গঠনের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে দলটি। ছোট populist দল বিএসডব্লিউ জানিয়েছে, তারা এএফডির সরকার গঠনে সহায়তা করতে পারে। সেটি হলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথমবারের মতো জার্মানির কোনো রাজ্যে উগ্র ডানপন্থী দল সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পাবে।
এ নির্বাচন জার্মানিতে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। গত এক দশকে এএফডি একটি প্রান্তিক প্রতিবাদী দল থেকে বড় রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
তবে মূলধারার দলগুলোর সামনে এখনো সুযোগ আছে। তারা চাইলে এই প্রবণতা বদলাতে পারে। এর জন্য প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক পদক্ষেপ।
এএফডির উত্থানের কারণ বুঝতে ভোটারদের মনোভাব এবং তাঁদের আর্থসামাজিক পরিস্থিতি দেখা জরুরি।
আমি যে গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির সহ-নেতৃত্ব দিই, সেই ডি|পার্টের সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, স্যাক্সনি-আনহাল্টের বাসিন্দারা জাতীয় গড়ের তুলনায় নিজেদের এলাকায় কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক পরিবেশের অবনতি নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন।
মানুষের অর্থনৈতিক সুযোগ ও সামাজিক সেবা নিয়ে যে প্রত্যাশা, তার সঙ্গে সরকারের দেওয়া সেবার বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে। এই হতাশা ও ক্ষোভকে কাজে লাগিয়েছে এএফডি।
তবে এএফডির ভোটারদের সবাই উগ্র ডানপন্থী অবস্থানের কারণে দলটিকে ভোট দেন না। জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৭৫ শতাংশ এএফডি ভোটার অন্য কোনো দলকে বিকল্প হিসেবে দেখেন না। তাঁরা দলটির প্রতি দৃঢ়ভাবে অনুগত।
তবে প্রায় এক-চতুর্থাংশ ভোটার অন্য দল বিবেচনা করতে পারেন। তাঁদের বড় অংশ মনে করেন না যে অর্থনীতি বা জীবনযাত্রার ব্যয়ের মতো বিষয়ে এএফডিই সবচেয়ে ভালো দল।
তাই এখন মূলধারার দলগুলোর উচিত এই ভোটারদের দিকে নজর দেওয়া। চলতি মাসের শেষ দিকে বার্লিন ও মেকলেনবুর্গ-ফোরপোমার্নে নির্বাচন রয়েছে। সেখানে এই ভোটারদের মনোভাব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদে মূলধারার দলগুলোর রাজনৈতিক কৌশলেও বড় পরিবর্তন দরকার।
জরিপ বলছে, রাজনৈতিক মতাদর্শের পার্থক্য থাকলেও জার্মানরা বর্তমান পরিস্থিতিতে গভীরভাবে অসন্তুষ্ট। সরকারের প্রতি মানুষের আস্থাও খুব কম। চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জের অনুমোদনের হার বর্তমানে মাত্র ১৩ শতাংশ। জরিপ শুরুর পর কোনো জার্মান সরকারপ্রধানের ক্ষেত্রে এটি সবচেয়ে কম।
তবে সরকারের ওপর অসন্তোষের অর্থ এই নয় যে মানুষ শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ চায় না। বরং মানুষ চায় সরকার দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নিক। কর্মসংস্থান, অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং স্থানীয় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সুবিধার উন্নতি চায় তারা।
এখানেই মূলধারার দলগুলো বড় ভুল করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তারা এএফডির নির্ধারণ করে দেওয়া রাজনৈতিক ইস্যুর পেছনে ছুটেছে। ভোট বাড়ানোর আশায় অভিবাসনকে নিজেদের রাজনৈতিক বক্তব্যের কেন্দ্রে এনেছে তারা।
কিন্তু জরিপে দেখা গেছে, ৮০ শতাংশ জার্মান মনে করেন অভিবাসন নয়, অর্থনৈতিক নীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
তাই এএফডির ভোট কেড়ে নিতে তাদের ভাষা ও রাজনৈতিক এজেন্ডা অনুসরণ করা উচিত নয় মূলধারার দলগুলোর। এতে উগ্র ডানপন্থী রাজনীতিই আরও স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠবে।
বরং মূলধারার দলগুলোকে নিজেদের রাজনৈতিক এজেন্ডা তৈরি করতে হবে। মানুষের জীবনযাত্রার বাস্তব উন্নতি ঘটাতে হবে। শুধু অর্থনীতির বড় বড় পরিসংখ্যান নয়, সাধারণ মানুষের জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলে—এমন বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে।
স্থানীয় সরকারকে আরও ক্ষমতা ও অর্থ দিতে হবে। শহর ও গ্রাম—দুই জায়গাতেই কর্মসংস্থান, অর্থনীতি ও সামাজিক সেবার উন্নতি ঘটাতে হবে।
জার্মানির ইতিহাসে উগ্র ডানপন্থার উত্থানকে অবহেলার ভয়াবহ পরিণতি রয়েছে। বিংশ শতাব্দীতে অর্থনৈতিক সংকটের সময় উগ্র ডানপন্থার বিপদকে যথেষ্ট গুরুত্ব না দেওয়ার ফল ইউরোপকে ভয়াবহভাবে ভোগ করতে হয়েছিল।
ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার জার্মানিকে আরও ভালো সিদ্ধান্ত নিতে হবে।









