জাহাজে পাল্টাপাল্টি হামলা, ফের উত্তপ্ত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত

জাহাজে পাল্টাপাল্টি হামলা, ফের উত্তপ্ত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত। জাহাজে হামলা-পাল্টা হামলার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান সংঘাত আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। শনিবার ইরান-সংশ্লিষ্ট তিনটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালানোর দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। পাল্টা ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) যুক্তরাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট তিনটি জাহাজসহ মোট ছয়টি জাহাজে হামলা চালানোর দাবি করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুটি তেলবাহী জাহাজকে ‘স্থায়ীভাবে অচল’ এবং উপসাগরীয় ওমান সাগরে থাকা আরেকটি জাহাজকে ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি হামলা চালানো হয়েছে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপের কাছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ইরিবও মার্কিন হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তারা জানিয়েছে, খার্গ দ্বীপের কাছে হামলার শিকার জাহাজটিতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। ওমান সাগরে আক্রান্ত দুটি ট্যাংকারের নাবিকদের লাইফবোটে করে নিরাপদে তীরে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে একটি জাহাজ খালি ছিল, অন্যটিতে তেল ছিল।

এর কয়েক ঘণ্টা পর পাল্টা হামলার দাবি করে ইরান। ইরিবের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইআরজিসি হরমুজ প্রণালিতে তিনটি তেলবাহী ট্যাংকার এবং অন্য এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিনটি জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে চলাচলের জন্য নির্ধারিত নয়—এমন একটি পথ ব্যবহার করায় তিনটি তেলবাহী জাহাজে হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করেছে তেহরান। একই সঙ্গে ওই রুট ব্যবহারকারী অন্য জাহাজগুলোকে সতর্ক করেছে তারা।

এর আগে শনিবার মার্কিন সামরিক বাহিনী দাবি করে, ইরানের আইআরজিসি দুটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজে হামলার চেষ্টা চালিয়েছিল। একটি বিমানবাহী রণতরি ও একটি গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ারকে লক্ষ্য করে একাধিক হামলা চালানো হলেও সেগুলো এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে মার্কিন বাহিনী। এতে কোনো মার্কিন সেনা আহত হয়নি বলেও জানিয়েছে সেন্টকম।

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সতর্ক করে বলেছেন, ইরান যদি মার্কিন জাহাজে হামলা চালায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেলবাহী জাহাজ ধ্বংস ও ডুবিয়ে দেবে। এর পরই ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ট্যাংকারে মার্কিন হামলার খবর আসে।

সেন্টকমের দাবি, হামলার শিকার তিনটি ইরানি তেলবাহী জাহাজ এমন একটি ‘ছায়া নেটওয়ার্কের’ অংশ, যেটি আইআরজিসি ও তাদের আঞ্চলিক মিত্রদের অর্থায়নে বিলিয়ন ডলার সরবরাহ করে।

এই পাল্টাপাল্টি হামলার কেন্দ্রে রয়েছে হরমুজ প্রণালি। ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী এই সরু জলপথটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রণালিটি কার্যত বন্ধ হয়ে আছে। বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ আগে এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হতো।

হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এখন ইরানের জন্য বড় কৌশলগত হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। তেহরান জানিয়েছে, জলপথটির ওপর তারা কোনো না কোনো মাত্রায় নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে চায়। এরই মধ্যে ইরান এমন জাহাজকে লক্ষ্য করেছে, যারা ইরানের জলসীমা এড়িয়ে ওমানের দিকের দক্ষিণাঞ্চলীয় পথ ব্যবহার করছে।

তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করে আসছেন, হরমুজ প্রণালি ‘খোলা’ রয়েছে। দক্ষিণের বিকল্প পথ দিয়ে জাহাজ চলাচলে মার্কিন সামরিক বাহিনী সহায়তা করছে বলেও জানিয়েছে ওয়াশিংটন।

এর আগে প্রায় এক মাসের তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতির পর গত রোববার নতুন করে হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের দাবি ছিল, হরমুজ প্রণালিতে নৌমাইন স্থাপনে ব্যবহার করা হতে পারে—এমন দুটি রকেট উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা ধ্বংস করতেই হামলা চালানো হয়েছিল। মঙ্গলবারও ইরানে ‘খুব বড়’ হামলা চালানোর কথা জানান ট্রাম্প। তবে একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাত খুব বেশি দিন স্থায়ী হবে না।

যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটি ও মিত্রদের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েত ও জর্ডানেও হামলার খবর পাওয়া গেছে।

এর মধ্যে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে মার্কিন হামলায় অন্তত চারজন নিহত হওয়ার অভিযোগও উঠেছে। নিহতদের মধ্যে দুই শিশু রয়েছে বলে দাবি করেছে তেহরান। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এ দাবির বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করলেও ঘটনাটি তদন্ত করা হবে বলে জানিয়েছেন। ইরানি রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, সিরিক এলাকায় একটি বাড়িতে চলা অনুষ্ঠানে ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ আঘাত হেনেছিল।

গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হয়। এরপর নতুন কোনো কূটনৈতিক সমঝোতার লক্ষণ দেখা যায়নি। বরং যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার কয়েক দিন পর ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেন ট্রাম্প।

চলমান সংঘাতের প্রভাব ইতিমধ্যে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও পড়েছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি ব্যয়ের চাপও বাড়ছে। শুক্রবার দেশটিতে ডিজেলের গড় দাম প্রতি গ্যালন ৫ দশমিক ৮৫ ডলারে উঠেছে, যেখানে এক বছর আগে তা ছিল ৩ দশমিক ৭১ ডলার।

ফলে জাহাজে পাল্টাপাল্টি হামলা শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সামরিক সংঘাতকেই তীব্র করছে না, এর প্রভাব পড়ছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

অনুসরন করুন

সর্বশেষ খবর

আর্কাইভ