আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ জবানবন্দিতে স্বামী-সন্তান হারানোর বেদনাদায়ক বর্ণনা দিলেন রুমা বেগম

স্বামীর হত্যার বিচার চাইতে ট্রাইব্যুনালে, মেয়েকে ধর্ষণের অভিযোগ; পরে আত্মহত্যা

আদর্শ গ্রাম ডেস্ক:

স্বামীর হত্যার বিচার চেয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিতে এসে নিজের মেয়েকে ধর্ষণের শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন রুমা বেগম। পরে সামাজিক অপমান ও মানসিক আঘাতে তার মেয়ে আত্মহত্যা করেন বলে জবানবন্দিতে দাবি করেছেন তিনি।

সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ দেওয়া জবানবন্দিতে স্বামী জসিম উদ্দিনের গুলিবিদ্ধ হওয়া, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু এবং পরবর্তী সময়ে মেয়েকে ধর্ষণের অভিযোগসহ পরিবারের ওপর ঘটে যাওয়া নানা ঘটনার বর্ণনা দেন রুমা বেগম।

জুলাই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ৯ জন নিহতের ঘটনায় করা মামলায় তিনি সপ্তম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন। এ মামলায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ফজলে নূর তাপস, সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে স্বামী

জবানবন্দিতে রুমা বেগম বলেন, তার স্বামী জসিম উদ্দিন মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্র ‘পদক্ষেপ’-এ চালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ১৮ জুলাই আন্দোলনে অংশ নিয়ে তিনি আহত অবস্থায় বাড়ি ফেরেন। পরদিন জুমার নামাজের কথা বলে তিনি আবার বাইরে বের হন।

সেদিন সন্ধ্যার দিকে এক প্রতিবেশীর কাছ থেকে রুমা জানতে পারেন, জসিম গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পড়ে আছেন। এরপর তিনি আত্মীয়কে সঙ্গে নিয়ে হাসপাতালে ছুটে যান।

হাসপাতালে গিয়ে স্বামীকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখতে পান বলে জবানবন্দিতে জানান রুমা। তার দাবি, জসিম তখনও জ্ঞান থাকা অবস্থায় তাকে জানান, গুলিতে তার দুটি আঙুল উড়ে গেছে এবং বুকে গুলি লেগেছে। তিনি আরও দাবি করেন, জসিম তাকে জানিয়েছিলেন যে মোহাম্মদপুরের আল্লাহ করিম মসজিদের সামনে আন্দোলনে অংশ নেওয়ার সময় তিনি গুলিবিদ্ধ হন।

চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু

রুমার জবানবন্দি অনুযায়ী, হাসপাতালে সেদিন বিপুলসংখ্যক আহত আন্দোলনকারী আসায় চিকিৎসক ও নার্সদের ওপর ব্যাপক চাপ ছিল। পরে জসিমের অস্ত্রোপচার করা হয়। তার শরীর থেকে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হচ্ছিল বলেও তিনি জানান।

পরবর্তীতে আরও অস্ত্রোপচার করা হয় এবং জসিমকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। জবানবন্দিতে রুমা বলেন, ২৯ জুলাই সকাল ৯টার দিকে তার স্বামী মারা যান।

লাশ পেতে ভোগান্তির অভিযোগ

স্বামীর মরদেহ হাসপাতাল থেকে নিতে গিয়ে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স নিয়ে নানা জটিলতার মুখে পড়ার অভিযোগও করেন রুমা বেগম।

তার দাবি, একাধিকবার বনানী ও মোহাম্মদপুর থানায় যোগাযোগ করেও তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজনীয় ক্লিয়ারেন্স পাওয়া যায়নি। পরে মোহাম্মদপুর থানায় মামলা করার পর ৩১ জুলাই তিনি স্বামীর মরদেহ পান। এরপর গ্রামের বাড়িতে নিয়ে তার দাফন সম্পন্ন করা হয় বলে জবানবন্দিতে জানান তিনি।

সাক্ষ্য দিতে আসার পর মেয়েকে ধর্ষণের অভিযোগ

জবানবন্দির সবচেয়ে বেদনাদায়ক অংশে রুমা বেগম অভিযোগ করেন, স্বামীর মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত কর্মকর্তার কাছে জবানবন্দি দিতে ২০২৫ সালের মার্চে ঢাকায় আসার পর তার বড় মেয়ে লামিয়া নিজ এলাকায় ধর্ষণের শিকার হন।

রুমার ভাষ্য অনুযায়ী, সে সময় লামিয়া দুমকি কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী ছিলেন। ১৮ মার্চ বাবার কবর জিয়ারত করে ফেরার পথে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের দ্বারা তিনি ধর্ষণের শিকার হন বলে রুমা অভিযোগ করেন।

তার দাবি, তিনি স্বামীর মামলায় সাক্ষ্য দিতে ঢাকায় আসার কারণেই তার মেয়েকে লক্ষ্য করে এ ঘটনা ঘটানো হয়। পরে বিষয়টি ছড়িয়ে পড়লে মেয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং একপর্যায়ে আত্মহত্যা করেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন রুমা।

পরিবারের ওপর নেমে আসে পরপর শোক

একদিকে স্বামীকে হারানো, অন্যদিকে মেয়ের মৃত্যু—পরপর দুই স্বজনকে হারিয়ে বিচারের আশায় দিন কাটাচ্ছেন রুমা বেগম।

জবানবন্দির শেষদিকে তিনি স্বামী জসিম উদ্দিনের হত্যার বিচার দাবি করেন। এ সময় ট্রাইব্যুনালে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তথ্যসূত্র: আমার দেশ

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

অনুসরন করুন

সর্বশেষ খবর

আর্কাইভ