প্রবৃদ্ধির আশা বাড়লেও মূল্যস্ফীতি নিয়ে শঙ্কা। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পুনরুদ্ধারের আভাস মিলছে। তবে এই ঘুরে দাঁড়ানোর পথ এখনো অনিশ্চয়তামুক্ত নয়। মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট, ঋণের বাড়তি খরচ, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং সীমিত বিনিয়োগ অর্থনীতির সামনে বড় বাধা হয়ে রয়েছে। এর মধ্যেই এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) বলছে, আগামী দুই অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ধীরে ধীরে বাড়তে পারে।
বুধবার প্রকাশিত এডিবির ‘এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক (এডিও) সেপ্টেম্বর ২০২৬’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২৭ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়াতে পারে ৪ শতাংশে। ২০২৫ অর্থবছরে দেশের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৫ শতাংশ।
অর্থাৎ প্রবৃদ্ধিতে কিছুটা গতি ফেরার সম্ভাবনা থাকলেও তা এখনো শক্তিশালী অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের পর্যায়ে যাচ্ছে না। এডিবির হিসাবে, ২০২৬ অর্থবছরের শেষ দিকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় কিছুটা বিঘ্ন ঘটিয়েছে। এর প্রভাবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও সাময়িকভাবে ধীর হয়েছে। তবে এই অভিঘাত সীমিত থাকবে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
অনিশ্চয়তা কমলে বাড়তে পারে ভোগ-বিনিয়োগ
এডিবির পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, বেসরকারি ভোগ ও বিনিয়োগ আগামী দিনের প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনের পর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কমে এলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এডিবির কান্ট্রি ডিরেক্টর চিংফেং ঝাং বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের পথে এগোচ্ছে। তবে বাহ্যিক অভিঘাত ও দেশের অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতার কারণে এই প্রক্রিয়া এখনো ঝুঁকিপূর্ণ।
তিনি বলেন, সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, আর্থিক খাত, জ্বালানি নিরাপত্তা ও ব্যবসার পরিবেশে সংস্কার দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার সময় এখনই। বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো, মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরি এবং অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে এসব সংস্কার প্রয়োজন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সংস্কারের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান করতে বাংলাদেশকে সহায়তা করার জন্য এডিবি প্রস্তুত বলেও জানান চিংফেং ঝাং।
মূল্যস্ফীতিতে কমার পর আবার বাড়ার আশঙ্কা
মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকছে। এডিবির হিসাবে, ২০২৫ অর্থবছরে ১০ শতাংশ থাকা মূল্যস্ফীতি ২০২৬ অর্থবছরে কমে ৮ দশমিক ৭ শতাংশে নামতে পারে। তবে পরের বছর আবারও ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ২০২৭ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশে উঠতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি।
এডিবির মতে, জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয়ের উচ্চ চাপ এবং জাহাজ চলাচলে সম্ভাব্য বিঘ্ন মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। এর সঙ্গে খাদ্যপণ্যের দামে ‘এল নিনো’র বিলম্বিত প্রভাব এবং ধীরে ধীরে শিথিল হতে থাকা মুদ্রানীতিও মূল্যস্ফীতিকে তুলনামূলক উঁচু পর্যায়ে রাখতে পারে।
ফলে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে দ্রুত স্বস্তি ফেরার সম্ভাবনা সীমিত।
বাড়তে পারে চলতি হিসাবের ঘাটতি
রফতানির তুলনায় আমদানির প্রবৃদ্ধি বেশি হলে চলতি হিসাবের ঘাটতি বাড়তে পারে। এডিবির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরে এই ঘাটতি জিডিপির ০ দশমিক ৩ শতাংশ হতে পারে। ২০২৭ অর্থবছরে তা বেড়ে ০ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।
তবে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার মধ্যেও রেমিট্যান্স প্রবাহ স্থিতিশীল থাকার আশা করছে এডিবি। শক্তিশালী রেমিট্যান্স ও পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ দেশের বৈদেশিক খাতে স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে সহায়তা করতে পারে।
তবে এই অবস্থান কতটা টেকসই হবে, তা নির্ভর করবে আর্থিক প্রবাহ, বিনিময় হারের নমনীয়তা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ওপর।
সেবা-কৃষিতে সম্ভাবনা, শিল্পে বাধা
২০২৭ অর্থবছরে সেবা ও কৃষি খাত প্রবৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হতে পারে বলে মনে করছে এডিবি। বিপরীতে শিল্প ও বিনিয়োগ খাতে বেশ কিছু বাধা থাকবে।
উচ্চ সুদে ঋণ নেওয়া, ঋণের সীমিত প্রাপ্যতা, জ্বালানি সংকট এবং দুর্বল বৈদেশিক চাহিদা শিল্প খাতের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। এর সঙ্গে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যাও বিনিয়োগের গতি কমিয়ে দিতে পারে।
রেমিট্যান্সনির্ভর বেসরকারি ভোগও প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে। তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় ভোগের ক্ষেত্রেও চাপ থাকতে পারে।
ঝুঁকি রয়েছে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ দুই দিকেই
বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির জন্য বেশ কয়েকটি ঝুঁকির কথাও জানিয়েছে এডিবি। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তেলের দাম বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক জাহাজ চলাচলে আরও বিঘ্ন, কঠোর বাণিজ্য বিধিনিষেধ এবং প্রধান রফতানি বাজারগুলোর প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়াও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
দেশের অভ্যন্তরে বিনিময় হারের ওপর চাপ, ব্যাংকিং খাতে নতুন সংকট, রাজস্ব সংস্কারে বিলম্ব এবং প্রত্যাশার তুলনায় কম উন্নয়ন ব্যয় ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এর সঙ্গে জলবায়ুজনিত অভিঘাতও প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এডিবির মতে, এসব ঝুঁকি একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির চাপও দীর্ঘায়িত করতে পারে।
টেকসই পুনরুদ্ধারে সংস্কারের বিকল্প নেই
এডিবির সর্বশেষ পূর্বাভাসে বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে সম্ভাবনা ও ঝুঁকি—দুই চিত্রই উঠে এসেছে। ২০২৫ অর্থবছরের ৩ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে প্রবৃদ্ধি ২০২৬ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ২০২৭ অর্থবছরে ৪ শতাংশে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে প্রবৃদ্ধি বাড়লেই অর্থনীতির সব সংকট কেটে যাবে না। মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা, ব্যাংকিং খাত, বিনিয়োগ ও বৈদেশিক খাতের দুর্বলতা পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াকে ঝুঁকির মধ্যে রাখতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে অর্থনীতিকে টেকসই পথে নিতে সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা, আর্থিক খাতে সংস্কার, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, রাজস্ব ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং ব্যবসার পরিবেশ সহজ করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে এডিবি।









