ইউনিকর্নের শিং নয়, নারহোয়ালের দাঁতে লুকিয়ে অনন্য রহস্য

বিজ্ঞান ডেস্ক:

শত শত বছর ধরে রহস্যময় এক প্রাণীর ‘শিং’ হিসেবে পরিচিত নারহোয়ালের লম্বা সর্পিল অঙ্গের ভেতরের রহস্য এবার উন্মোচন করেছেন বিজ্ঞানীরা। উন্নত থ্রিডি এক্স-রে ইমেজিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে গবেষকেরা জানতে পেরেছেন, এটি আসলে কোনো শিং নয়—নারহোয়ালের মুখ থেকে বেরিয়ে থাকা একটি দীর্ঘ ও সরু দাঁত।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নারহোয়ালের এই দাঁত প্রায় ৩ মিটার (১০ ফুট) পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, দাঁতের বাইরের স্তর ও ভেতরের স্তরে থাকা গঠন বিপরীতমুখী সর্পিল বিন্যাস তৈরি করে। এই বিশেষ কাঠামোই দাঁতটিকে শক্ত ও স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বিপরীতমুখী দুই সর্পিল

গবেষণায় দেখা যায়, দাঁতের বাইরের অংশ সিমেন্টাম নামের টিস্যু দিয়ে তৈরি এবং সেখানে বামমুখী সর্পিল কাঠামো রয়েছে। অন্যদিকে ভেতরের ডেন্টিন অংশে রয়েছে ডানমুখী সর্পিল বিন্যাস।

গবেষকদের ধারণা, এই বিপরীতমুখী সর্পিল কাঠামো নারহোয়ালের দাঁতকে বাঁকানো বা পেঁচিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থেকে রক্ষা করে এবং দাঁতটিকে তুলনামূলকভাবে সোজা রাখতে সহায়তা করে।

গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ডেনমার্কের আরহুস বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাদানবিজ্ঞানী হেনরিক বির্কেডাল জানিয়েছেন, দাঁতের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশে থাকা খনিজযুক্ত কোলাজেন তন্তুগুলোর বিন্যাস থেকেই এই বিশেষ কাঠামো তৈরি হয়েছে।

প্রকৃতির তৈরি শক্তিশালী ‘কম্পোজিট’

বিজ্ঞানীরা বলছেন, কোলাজেন তন্তু একই সঙ্গে শক্ত ও নমনীয়। দাঁত ও হাড়ের মতো নারহোয়ালের দাঁতেও এসব তন্তু ক্যালসিয়ামজাত খনিজ কণার মাধ্যমে শক্তিশালী হয়।

দাঁতের ভেতরে ও বাইরে বিপরীতমুখী সর্পিল বিন্যাস থাকায় দুই ধরনের যান্ত্রিক শক্তির মধ্যে এক ধরনের ভারসাম্য তৈরি হয়। ফলে বাঁকানো ও পেঁচানোর চাপ মোকাবিলায় দাঁতটি বিশেষ সুবিধা পায়। এই প্রাকৃতিক নকশা ভবিষ্যতে নতুন ধরনের বায়ো-ইনস্পায়ার্ড বা প্রকৃতিনির্ভর উপাদান তৈরিতে বিজ্ঞানীদের অনুপ্রাণিত করতে পারে।

একসময় ‘ইউনিকর্নের শিং’ হিসেবে বিক্রি হতো

নারহোয়ালের দাঁতকে ঘিরে রহস্য অবশ্য নতুন নয়। মধ্যযুগে ইউরোপে এগুলোকে ইউনিকর্নের শিং বলে মনে করা হতো। এমনকি বিষ নিষ্ক্রিয় করা ও রোগ সারানোর মতো অলৌকিক ক্ষমতা এসব ‘শিং’-এর রয়েছে বলেও বিশ্বাস করা হতো।

এই কারণে নারহোয়ালের দাঁতের মূল্য একসময় সোনার চেয়েও বেশি ছিল। ডেনমার্কের রাজপরিবারের ঐতিহাসিক করোনেশন চেয়ার তৈরিতেও নারহোয়ালের দাঁত ব্যবহার করা হয়েছিল।

এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি দাঁতের কাজ

নারহোয়াল আর্কটিক মহাসাগরের শীতল পানিতে বসবাস করে। বেশির ভাগ পুরুষ নারহোয়ালের একটি দাঁত থাকে, যদিও অল্পসংখ্যক স্ত্রী নারহোয়ালেরও দাঁত দেখা যায়। কোনো কোনো পুরুষের দুটি দাঁতও থাকতে পারে।

এই দাঁতের প্রকৃত ভূমিকা নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে। পুরুষদের মধ্যে সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, পারস্পরিক প্রতিযোগিতা, খেলাধুলা কিংবা পরিবেশ অনুভবের মতো বিভিন্ন কাজে এটি ব্যবহৃত হতে পারে বলে বিজ্ঞানীদের ধারণা।

নতুন গবেষণা তাই শুধু নারহোয়ালের রহস্যময় দাঁতের গঠনই ব্যাখ্যা করেনি; প্রকৃতি কীভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী ও স্থিতিশীল কাঠামো তৈরি করতে পারে, তারও নতুন একটি উদাহরণ সামনে এনেছে।

সূত্র: রয়টার্স

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

অনুসরন করুন

সর্বশেষ খবর

আর্কাইভ