হাসিনার পথে হাঁটলে পরিণতি তার মতোই হবে: বিরোধীদলীয় নেতা। বর্তমান সরকারও শেখ হাসিনার সরকারের মতো একই পথে হাঁটছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, যে পথে শেখ হাসিনা ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, বর্তমান সরকারও সেই পথে এগোচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে পরিণতিও একই হবে বলে সতর্ক করেন তিনি।
শনিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে রংপুর জিলা স্কুল মাঠে ১১ দলীয় জোটের ঢাকা-রংপুর লংমার্চের সমাপনী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন জামায়াত আমির।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশের ১৮ কোটি মানুষের অধিকার রক্ষায় প্রয়োজন হলে আট দফা দাবি এক দফায় পরিণত হবে। জনগণের স্বার্থে আন্দোলন আরও জোরালো করার কথাও জানান তিনি।
গণভোটের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, জনগণের প্রায় ৭০ শতাংশ গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছে। কিন্তু সেই রায় বাস্তবায়ন করা হয়নি। জনগণের প্রতি দেওয়া অঙ্গীকারও রক্ষা করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
জামায়াত আমির প্রশ্ন তোলেন, সংবিধানে গণভোটের বিধান না থাকলে ২০২৪ সালের গণআন্দোলন কোন সংবিধানের ভিত্তিতে হয়েছে। ফ্যাসিবাদীদের সংবিধান অনুসরণ করা হয়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষায়, যদি গণভোটের রায় গ্রহণ করা হয়, তাহলে এর সবকিছুই মানতে হবে; আর না মানলে পুরো বিষয়টি প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা দিতে হবে।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে তিস্তা বাঁচানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও সাত মাসে এর দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি। জনগণকে বারবার আশ্বাস দিয়ে বিভ্রান্ত করা ঠিক নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী নির্বাচনের আগে জনগণের কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সরকার গঠনের সুযোগ পেলে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। উত্তরবঙ্গকে কৃষির প্রধান অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলা এবং নদীগুলোর প্রাণ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলেন তিনি।
নির্বাচনের ফল মেনে নেওয়ার প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, দেশের স্বার্থে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে তারা ফলাফল মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু সরকার গঠনের পর সংসদে গিয়ে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো ভুলে গেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
দেশের বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সারের সংকট নিয়েও কথা বলেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, মানুষ নিয়মিত বিদ্যুৎ পাচ্ছে না, রংপুরের অনেক মানুষ গ্যাস পাচ্ছে না এবং কৃষক প্রয়োজনীয় সার পাচ্ছেন না। কর্মসংস্থানের সংকটের কথাও তুলে ধরেন তিনি। তার অভিযোগ, সাধারণ মানুষের জন্য কর্মসংস্থান না থাকলেও একটি শ্রেণি চাঁদাবাজির মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের সুযোগ পাচ্ছে।
চাঁদাবাজির কারণে দেশের মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে বলেও দাবি করেন তিনি। এর প্রভাবে দ্রব্যমূল্য বাড়ছে এবং মানুষের জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন জামায়াত আমির।
সিরাজগঞ্জে এক ব্যক্তির ওপর হামলার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনা আবার ঘটলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।
২০২৪ সালের আন্দোলনে নিহত আবু সাঈদের প্রসঙ্গও উঠে আসে তার বক্তব্যে। তিনি আবু সাঈদকে ওই আন্দোলনের অন্যতম প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করেন।
একটি নতুন আইন নিয়েও আপত্তি জানান শফিকুর রহমান। তার দাবি, আইনটির কিছু বিষয় কোরআন ও সুন্নাহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এ কারণে রাষ্ট্রপতিকে এতে স্বাক্ষর না করার আহ্বান জানিয়েছেন বলে জানান তিনি। আইনটি কার্যকর হলে এর বিরুদ্ধে মুসলমানরা প্রতিবাদ করবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নাহিদ ইসলামের অভিযোগ
সমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম সরকারের বিরুদ্ধে পুলিশকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের অভিযোগ করেন।
তিনি বলেন, পুলিশ সংস্কার কমিশন করা হয়নি। একই সঙ্গে গুমসংক্রান্ত আইন এবং এসআরবি গঠনের মাধ্যমে পুলিশকে আবারও বিরোধী দল দমনে ব্যবহারের চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তবে এ ধরনের উদ্যোগ সফল হবে না বলে মন্তব্য করেন নাহিদ।
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। নাহিদ ইসলাম বলেন, গণভোটে জনগণ ভোট দিলেও সেই রায় বাস্তবায়িত হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আন্দোলনে নিহত ওসমান হাদীর বিচার নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
তার দাবি, দেশে থাকা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধেও কার্যকর বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। শুধু দেশের বাইরে থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে রায় দেওয়া যথেষ্ট নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, সারাদেশে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সারের সংকট রয়েছে। বিশেষ করে কৃষিনির্ভর রংপুর অঞ্চলের মানুষ এসব সংকটে বেশি ভুগছেন। একই সঙ্গে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও এলাকায় দলীয়করণ, চাঁদাবাজি, দখলদারত্ব ও সন্ত্রাসের অভিযোগও তোলেন তিনি।
লংমার্চে ব্যাপক অংশগ্রহণ
এর আগে শনিবার সকাল ৭টায় রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে উদ্বোধনী সমাবেশের মাধ্যমে ঢাকা-রংপুর লংমার্চ শুরু হয়। আয়োজকদের হিসাবে, প্রায় তিন হাজার গাড়ির বহর নিয়ে কর্মসূচি রংপুরের উদ্দেশে যাত্রা করে।
পথে গাজীপুরের ভোগড়া, টাঙ্গাইলের নগর জালফৈ, সিরাজগঞ্জ চৌরাস্তা, বগুড়ার চারমাথা ও গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে পথসভা হয়। বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় মানুষ লংমার্চে অংশ নেওয়া নেতাকর্মীদের স্বাগত জানান।
বিকেল ৫টার দিকে লংমার্চের রংপুরে পৌঁছানোর কথা থাকলেও পথে মানুষের উপস্থিতির কারণে সময় লাগে বেশি। জাতীয় নেতারা রাত সাড়ে ৮টার দিকে সমাবেশস্থলে পৌঁছান। পরে রাত সাড়ে ৯টার দিকে শফিকুর রহমান বক্তব্য দেন। এ সময় রংপুর জিলা স্কুল মাঠে বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতি ছিল বলে আয়োজকেরা জানান।
সমাবেশে বক্তৃতার পাশাপাশি বিভিন্ন দাবির সমর্থনে সংগীত পরিবেশন করা হয়।
লংমার্চের ঘোষিত দাবির সঙ্গে রংপুর অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবিকেও যুক্ত করা হয়। আয়োজকেরা এটিকে উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি হিসেবে তুলে ধরেন।
সমাবেশে জামায়াতের নায়েবে আমির এ টি এম আজহারুল ইসলাম সভাপতিত্ব করেন। এতে এলডিপি চেয়ারম্যান কর্নেল অলি আহমেদ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নেতাসহ ১১ দলীয় জোটের বিভিন্ন দলের নেতারা বক্তব্য দেন। জামায়াত, এনসিপি ও বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারাও সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন।









